| |
খবরটা প্রথম পেয়েছিলাম অপিসের ইমেলে,
খুব তাড়াহুড়ো ছিলো তাই প্রথমটা দেখিনি। এরপর ইমেল
আসতে থাকে ব্যক্তিগত একাউন্টে,
খরবটা পড়তেই বুঝতে পারি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়ে
আবার রংপুরেরও মেয়ে। না কিছুতেই আমার স্মৃতির পাতায়
মেয়েটার মুখটাকে ভাসাতে পারিনি।
আফরোজা ফেরদৌস রুমা চিরদিনের জন্য চলে গেছে মাত্র
কয়েকদিন আগে। টরোন্টো বড় শহর হলেও আমাদের কমিউনিটি
ছোট,
মাত্র গুটিকয়েক বাংগালী আমরা,
সুখে/দুখে
সময়ে/অসময়ে
এই শহরে আমরা পাশাপাশি দাড়াই, আমার
৪ বছরের কানাডার জীবনে আমি খুব পরিস্কার করে এই
সত্য উচ্চারন করতে পারি। তার চেয়েও ছোট হচ্ছে
বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষেরা। তারই প্রথম প্রমান
মিলেছিলো যখন এই শহরে আমি বৃহত্তর রংপুরের পিকনিকে
গিয়েছিলাম,
২০০৮ সালের সামারে একদল রংপুরপ্রেমী মানুষের ভিতর
সেকি উত্তেজনা। কথা অন্য দিকে চলে যাচ্ছে,
রুমাকে নিয়ে কথা বললাম কয়েকজনের সাথে,
না কিছুতেই না,
আমি মনে করতে পারছি না,
খুব অল্প বয়সে চলে গেলো,
শুনলাম ক্যাম্পাসে ভালো
ব্যাডমিন্টন খেলতো,
আমার হলেই থাকতো,
কেন মনে করতে পারছি না? কিছুতেই মৃত্যুর খরবটা
আমার মাথা থেকে যাচ্ছে না,
কিছুতেই না,
কথা বলছি অনেকের সাথেই ফোনাফুনিও চলছে বিস্তর,
ছুটির দিন সকাল ১১টার মতো হবে ফোন পেলাম রংপুরের
আজাদ ভাই এর কাছ থেকে,
উদ্যোগী মানুষ একজন জানালেন রুমাকে নিয়ে ছোট দোয়া
পড়ার আয়োজন হয়েছে,
আমি গেলে খুশি হবেন। আগামী পরশু আমিরেকাতে যাবো আমি,
বাইরে তীব্র শীত, ছোট
ছেলে নিয়ে
কোথায় বের হবো আমি? ফোনের ওই প্রান্তে আজাদ ভাইয়ের
অপেক্ষা,
আমি কয়েক মুহুর্ত সময় নিয়ে বলে ফেললাম যেতে পারি
কেউ যদি দয়া করে আমাকে একটা রাইড দেন। জানি আবদারটা
অশোভন,
একজন মানুষ চলে গেছেন অথচ আমি স্বার্থের বাইরে পা
ফেলছি না,
কিন্তু এই শহরেও মানুষ নিজেকে ছাপিয়ে অন্যর পাশে
এসে দাড়ায় আর এটুকু আছে বলেই পৃথিবীতে
জন্ম/মৃত্যুর
পরও মানুষ আবার বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে,
আজকের আয়োজকদের সবার মধ্যেই সেই প্রেরনাই যেন ফিরে
ফিরে
দেখা
দিলো। আজাদ ভাই ব্যবস্থা করলেন,
ঠিক সময়ের ৫ মিনিট আগেই আমাকে নিতে এলেন রংপুরের
আরো একজন নিবেদিত প্রাণ মানুষ জুয়েল ভাই,
জানালেন উনি এখুনি রুমার মা/বাচ্চা/স্বামীকেও
তার গাড়িতেই তুলবেন।
আমি অপেক্ষা করি রুমার বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই এগিয়ে এলেন খালাম্মা, মাসুম ভাই ও
দুটো মেয়ে। পাঁজা পাঁজা বরফে ছেয়ে আছে শহর, তীব্র
শীতের বাতাস,
এই শহরে কেমন করে পরিবার মেনে নিয়েছে এই সত্য?
ছোটখাটো গড়নের শক্ত মানুষ খালাম্মার সাথে আলাপ শুরু
করি,
বুঝতে পারি গত
একবছর রুমা ভুগছিলো দুরারোগ্য
ক্যান্সারে তাই শোক সয়ে গেছে অনেকটাই,
তবুও আমি মায়ের চোখের তারায় সন্তান হারানোর ছায়া
দেখতে পাই,
পিছনের সীটে বসা মেয়েদুটোর মুখের আদলে রুমার মুখটা
দেখতে চেষ্টা করি,
না কিছুতেই রুমাকে দেখতে পাই না,
কেন রুমা কে চিনতে পারছি না আমি? আমাকে যে সবাই
বলল একবার দেখলেই চিনতে পারবো অস্বস্তিটা কাঁটা হয়ে
থাকে। কথার ফাঁকে এবার খালাম্মাকেই জিজ্ঞেস করি
রুমার কোন ছবি আছে নাকি আপনার কাছে? খালাম্মা বেশ
সহজ হয়েই কথা বলছিলেন,
হঠাৎ বললেন হ্যাঁ মা,
আমার প্রথম সন্তান,
ওকে বুকে নিয়েই তো বাকী জীবন পাড় করতে হবে,
বুকের ভিতর থেকে খালাম্মা বের বরে দিলেন রুমার ছোট
একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি। আর অমনি আমার স্মৃতিতে
জীবন্ত রুমা,
ব্যাডমিন্টন কাধেঁ রুমা হেঁটে যাচ্ছে ক্যাম্পাস মাঠে
কি উজ্জল সেই দিনগুলো এই তো মাত্র ১৪ বছর,
রুমা কোথাও যায়নি। আমার স্মৃতিতে অমলিন রুমাকে মনে
করতে আমার আর কোন দিন কষ্ট হবে না,
কোন দিনও না।
|
|